ক্লাস সেভেন এর কথা লেখা শুরু করি। ক্লাস সেভেন আলাদা হিসেব করার কারণ ওই বছর আমার জীবনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। ক্লাস সেভেনে পরীক্ষা দেই "শহীদ লেফটেনেন্ট জেনারেল মোহাম্মদ মুশফিক বীর উত্তম উচ্চ বিদ্যালয়"। এই স্কুলটা ওই এলাকার মোটামুটি ভালো স্কুল ছিল তাই "গরীবে নেওয়াজ" থেকে গেলাম মুশফিকে। মুশফিকে আমার ছোটবেলার বন্ধু শজারু শোভন আবার আমার সঙ্গী হল। কিন্তু সেই বছর শজারুর চেয়েও যার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হল তার নাম "ব্রীজ"। ব্রীজের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতার কারণ ওর বাবার বই এর কালেকশন। ব্রীজের বাবা ছিল একজন বিশাল বই সংগ্রাহক। ওর বাসায় যখন আমি প্রথম যাই তখন অবাক হয়ে দেখি, বাসার সোফা এবং আরো কয়েকটি ফার্নিচার ঘরের বাইরে খোলা জায়গায় তেরপল দিয়ে ঢাকা। আর ঘরের ভেতরে আসবাবের পরিবর্তে বই আর বই। এমন বাসা আমি কখনো দেখি নাই এবং ভবিষ্যতে দেখব বলে মনে হয় না। বাসার মেঝে থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত শুধু বই। খাটের নিচ, বিভিন্ন তাক (রান্নাঘর, বাথরুমের উপরে), আলমারি, মানে যে দিকে তাকাই খালি বই। আমি যে কি অবাক হয়েছিলাম তা বলে বোঝাতে পারব না!
এরপর থেকে শুরু হল আমার বই হনন প্রক্রিয়া। একেকটা বই এর স্তুপে উঠে একেকদিন একেক বই নিতাম। বাসায় এসে সেগুলো পড়তাম। কিছুদিন পর দেখা গেল আমি পাঠ্য বাই বাদ দিয়ে শুধু গল্পের বই পড়ি। যার ফলে আমার বাসা থেকে বই পড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত হল। কিন্তু নিষিদ্ধ হলে কি হবে, বই পড়া তো বাদ দেয়া যায় না। তখন সেই পুরানো প্রসেস। পাঠ্য বই এর ভেতরে গল্পের বই রেখে পড়া। অতঃপর ধরা খাওয়া এবং পিটুনি। এরপর বই পড়া শুরু হল রাস্তায়। স্কুল যাবার পথে হেঁটে হেঁটে বই পড়া। সেখানেও নালিশ। তারপর ক্লাসে বসে বই পড়া। এভাবে চলতে থাকল।
ক্লাসের অন্যান্য ছেলেদের কথা বলি। নাহিয়ান ছিল ফার্ষ্ট বয় এবং ক্যাপ্টেন। তাই ক্লাসে ওর দাপটের অভাব ছিল না। স্যার না থাকা অবস্থায় ক্লাসে কথা বলার জন্য নাহিয়ান এর অনেক মার খেয়েছি। মারের প্রসেস ছিল মাথার মধ্যে হতের মাঝের আঙ্গুল মুঠো করে মারা। প্রচন্ড ব্যাথা পাওয়া যেত। নাহিয়ান আর আমি এখন ইউনিভার্সিটিতে একই ডিপার্টমেন্টে পড়ি। তবে এই নাহিয়ান আর আগের নাহিয়ান আকাশ পাতাল তফাৎ।
এছাড়া ছিল রায়হান, মিহির, মুন্না, আসিফ, শিবলি এবং আরো অনেকে। আমাদের ক্লাস হত মেয়েদের সাথে। তবে মেয়েদের সাথে আমাদের কথা হতনা। তাই তাদের কারো নাম এখন মনে নাই। শুধু মনে আছে দুজন জমজ বোন ছিল। ওই স্কুলে টিফিনে আমাদের খেলা হত "গোল্লাছুট"। আমি পারতাম না। তাই আমাকে বেশির ভাগ সময় গোল্লা বানানো হত।
ওই স্কুলে আমার অপছন্দের স্যারের অভাব ছিল না। একজনের নাম রিপন। সে অংক করাত। যদিও সে অংকের অ ও জানে না। তার কাছে কোচিং করলে তারা ভালো মার্কস পেত বাকিরা গোল্লা। তার কোচিং এ পড়ানোর ব্যাপারটাও ছিল অদ্ভুত। তার কাছে প্রত্যেক ক্লাসের কিছু অংক নোট খাতা ছিল। সেসব খাতায় চ্যাপ্টার অনুসারে সব অংক করা ছিল। তার কাছে যারা পড়ত তাদেরকে একেকটা খাতা দেয়া হত এবং বলত যে অমুক চ্যাপ্টার থেকে নোট কর। তারপর সে ঘুম দিত। ছেলেমেয়েরা ওই চ্যাপ্টার নোট তুলে স্যারের বাসা থেকে চলে আসত। এই হল তার পড়ানোর প্রক্রিয়া। ওই স্কুলের মোটামুটি সব স্যারই কোচিং নির্ভর ছিল। তবে যদ্দুর মনে পড়ে নাহিয়ান কারো কাছে কোচিং করত না। বরাবরই নাহিয়ান ভালো ছাত্র ছিল। নাহিয়ানের প্রিয় বই ছিল "টুকুনজিল" আর "প্রজেক্ট নেবুলা"। এই দুইটা বই আমাকে পড়তে দেয়ার কথা। নাহিয়ান আমাকে টুকুনজিল পড়তে দিয়েছিল, কিন্তু প্রজেক্ট নেবুলা আনব আনব করে দেয়নি। :) :)
এর মধ্যে প্রথম সাময়িক এবং দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা হল এবং জীবনে প্রথম বারের মত আমি ফস্কালাম। মানে আমার রোল এক থেকে পিছিয়ে গেল। শুধু পেছালই না বরং অনেক পেছাল। প্রায় বিশ এর কাছাকাছি। বাসায় তো হেব্বি কড়াকড়ি। বই পড়া অনেকটা বন্ধ হবার পথে।
এদিকে সেভেনে দূরের স্কুলে চলে যাওয়ায় রাশেদ এর সাথে আস্তে আস্তে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। প্রথম দিকে আমার স্কুল ছুটি হলে আমি রাশেদ এর জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম ওর স্কুলের সামনে। ওর স্কুলে তখন টিফিন হত আর আমরা একসাথে বাসায় যেতাম। কিন্তু এই প্রসেস বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। আমার সাথে ব্রীজ এর ঘনিষ্ঠতা বাড়ার সাথে সাথে রাশেদ এর সাথে দূরত্ব তৈরি হল। সেভেন এর মাঝামাঝি সময়ে রাশেদ এর সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল। তারপর রাশেদ এর সাথে আবার দেখা হয় ক্লাস নাইন এ। তবে নতুন করে ঘনিষ্ঠতা ক্লাস টেন এ।
যাই হোক শেষ পর্যন্ত মুশফিক স্কুলে আমার রোল হয় ১৬। আমার বাসা থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে আমাকে এই স্কুলে রাখা হবে না। কারণ আমি খারাপ হয়ে যাচ্ছি। আমার মা আমাকে স্কুল ছাড়িয়ে আনতে গেলেন। তখন স্কুলের এক স্যার "নুরুল হক" আমার মাকে অনেক অপমান করলেন। আমি আজও বুঝি না যে সেটার কারণ কি ছিল। একজন গার্জিয়ান এর প্রতি যার নূন্যতম সম্মানবোধ নাই সে যে কিভাবে টিচার হয় আমি বুঝিনা। সেদিন আমার মা বাসায় এসে অনেক কেঁদেছিলেন। মুশফিক থেকে এসে আমার স্থান হয় আবার গরীবে নেওয়াজ এ। মোটামুটি এই হল আমার ক্লাস সেভেন জীবন।
আমার খুব ভালো লাগছে। তোর দেখে ইছছা হয় আমিও লিখি। কিনতু আমার জীবনের কোনো লেভেল আমি খুেয পাই না।
উত্তরমুছুনkeep it up dost. জানোছ দোস্ত তর এই সব যখন পরি তখন মনে হয় আমা্র চোখের সামনে ভাসতেছে।
ধন্যবাদ...ঃ)
উত্তরমুছুনতোদের ভালো লাগা দেখেই আরো লিখতে ইচ্ছা করে। তুইও লেখা শুরু কর। আমার মনে হয় প্রত্যেকটা মানুষের জীবনই ইউনিক। সবার জীবনেই নানান ইন্টারেস্টিং ঘটনায় ভরপুর। তাই অন্যের জন্য না হলেও নিজের জন্য লেখ।